এই চাওয়াগুলো খুব বড় কোনো দাবি নয়। এগুলো একজন নাগরিকের স্বাভাবিক অধিকার। কিন্তু বাস্তব জীবনে এই সাধারণ প্রত্যাশাগুলো পূরণ করাই অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আর সেখানেই সামনে আসে—আইনের শাসন, সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নাগরিক অধিকার এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রশ্ন।
একটি সমাজ তখনই নিরাপদ, যখন সাধারণ মানুষ মনে করেন—তিনি বিপদে পড়লে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে।
রাস্তায় ছিনতাই, চুরি, মাদক, কিশোর অপরাধ, সাইবার অপরাধ কিংবা অন্য যেকোনো অপরাধ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করে। তবে অপরাধ দমন করাই শেষ কথা নয়। অপরাধের শিকার ব্যক্তি যেন দ্রুত আইনি সহায়তা পান এবং অপরাধের তদন্ত ও বিচার যেন নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়—এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষ যখন বিশ্বাস করেন যে আইনের কাছে সবাই সমান, তখনই রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তৈরি হয়।
আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—সেখানে পরিচয় নয়, অপরাধ ও প্রমাণই বিবেচ্য হবে। সাধারণ মানুষ হোক কিংবা প্রভাবশালী—আইনের চোখে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড একই থাকবে, এটাই প্রত্যাশা।
দুর্নীতির কথা শুনলে অনেকেই বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ কিংবা বড় কোনো অনিয়মের কথা ভাবেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে দুর্নীতির অভিজ্ঞতা অনেক সময় আরও ছোট ছোট জায়গায়।
একটি সনদ নিতে অতিরিক্ত অর্থ, একটি ফাইল এগিয়ে নিতে তদবির, একটি সরকারি সেবা পেতে অযথা হয়রানি—এসবও মানুষের কাছে দুর্নীতির বাস্তব চিত্র।
এই সংস্কৃতি বন্ধ করা জরুরি। কারণ দুর্নীতি শুধু অর্থের ক্ষতি করে না; এটি মানুষের সময় নষ্ট করে, অধিকার ক্ষুণ্ন করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়।
দুর্নীতি প্রতিরোধে শুধু অভিযান চালালেই হবে না। সরকারি সেবাকে সহজ করতে হবে, প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে হবে এবং কোথাও অনিয়ম হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বাজারে একটি পণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু বাজারেই থাকে না। একজন বাবা-মায়ের মাসিক বাজেটে তার প্রভাব পড়ে, একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনার খরচে প্রভাব পড়ে, একটি পরিবারের চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের ওপরও প্রভাব পড়ে।
দ্রব্যমূল্য তাই শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়—এটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করা, সরবরাহব্যবস্থা ঠিক রাখা, মজুতদারি ও কারসাজি প্রতিরোধ এবং ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তবে এখানেও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—শুধু অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনাই পারে সাধারণ মানুষকে স্থায়ী স্বস্তি দিতে।
একজন নাগরিকের অধিকার শুধু ভোট দেওয়া বা মতপ্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপদে বেঁচে থাকা, ন্যায়বিচার পাওয়া, বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, আইনগত সহায়তা পাওয়া এবং সম্মানের সঙ্গে সরকারি সেবা গ্রহণ করাও নাগরিক অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে—আইন মেনে চলা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা।
অধিকার ও দায়িত্ব—এই দুটি পাশাপাশি চললেই একটি সুস্থ রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে উঠতে পারে।
সাংবাদিকতা মূলত মানুষের জন্য। যে মানুষটি নিজের কথা বলতে পারেন না, সাংবাদিক তার কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে পারেন। যে অনিয়মটি সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সেটি সামনে আনতে পারে। যে প্রশ্নের উত্তর মানুষ জানতে চান, সাংবাদিক সেই প্রশ্নটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে রাখতে পারেন।
তবে সাংবাদিকতার শক্তি শুধু প্রশ্ন করার মধ্যে নয়; সত্য যাচাই করে প্রশ্ন করার মধ্যেই সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি।
কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলেই সেটিকে সত্য হিসেবে প্রকাশ করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়। তথ্য যাচাই করতে হবে, প্রমাণ দেখতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
কারণ একটি ভুল সংবাদ একজন মানুষের সম্মান, প্রতিষ্ঠান কিংবা পরিবারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই দায়িত্ব আরও বেড়েছে। একটি অযাচাইকৃত তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই সাংবাদিককে হতে হবে দ্রুত, কিন্তু একই সঙ্গে সতর্ক; সাহসী, কিন্তু দায়িত্বশীল।
স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া একটি সুস্থ সমাজ কল্পনা করা কঠিন। গণমাধ্যমকে প্রশ্ন করতে হবে, মানুষের সমস্যা তুলে ধরতে হবে, ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।
কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও থাকতে হবে।
কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক পক্ষপাত, ব্যবসায়িক চাপ কিংবা জনপ্রিয়তার আকাঙ্ক্ষা যেন সংবাদকে প্রভাবিত না করে—এটাই হওয়া উচিত সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তি।
সাংবাদিকের কলম কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধের অস্ত্র নয়; এটি সত্য অনুসন্ধানের একটি মাধ্যম। একটি সংবাদ প্রকাশের আগে সাংবাদিকের নিজের কাছেই প্রশ্ন থাকা উচিত—এই তথ্য কি সত্য? এর পক্ষে কি যথেষ্ট প্রমাণ আছে? এটি কি জনস্বার্থে প্রকাশ করা প্রয়োজন?
এই তিনটি প্রশ্ন সাংবাদিকতাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে হয়রানির ভয় করবেন না; আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচারের আশা হারাবেন না; সরকারি অফিসে গিয়ে সেবা পাওয়ার জন্য অনৈতিক কোনো পথ খুঁজতে হবে না।
আমরা এমন একটি বাজার চাই, যেখানে একজন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষও তার পরিবারের প্রয়োজনীয় পণ্য সম্মানের সঙ্গে কিনতে পারেন।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে ভিন্নমত থাকলেও মানুষ একে অপরের অধিকারকে সম্মান করবেন।
আর আমরা এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে সাংবাদিকতা হবে সত্য, তথ্য, ন্যায় ও জনস্বার্থের পক্ষে—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অন্ধ সমর্থনে নয়।
একটি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রকে নিজের বলে মনে করেন। আর সেই অনুভূতি তৈরি হয় নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সুশাসন, জবাবদিহি ও নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়ে।
আমরা কেউই এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে অন্যায় দেখেও মানুষ চুপ করে থাকবে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস থাকবে, সত্য প্রকাশের সুযোগ থাকবে এবং ন্যায়বিচারের ওপর মানুষের আস্থা থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করবে, প্রশাসন জনগণের সেবা করবে, রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকার রক্ষা করবে এবং গণমাধ্যম সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে—এই সমন্বিত ব্যবস্থাই পারে একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে।
শেষ পর্যন্ত দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হতে পারে একটি সাধারণ প্রশ্ন—
“এই দেশের একজন সাধারণ মানুষ কি নিরাপদ, সম্মানজনক ও ন্যায্য অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারছেন?”
এই প্রশ্নের উত্তর যত বেশি ইতিবাচক হবে, ততই শক্তিশালী হবে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।
নিরাপদ নাগরিক, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা—এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে মানুষের প্রত্যাশার বাংলাদেশ।
(লেখক: মোঃ শাহজাহান বাশার
সাংবাদিক, দৈনিক জনতার মতামত, দৈনিক মানবাধিকার প্রতিদিন ও দৈনিক আগামীকাল
যুগ্ম আহ্বায়ক, বাংলাদেশ অনলাইন গণমাধ্যম প্রকাশক ও সম্পাদক পরিষদ)
মন্তব্য করুন