নিজস্ব প্রতিবেদন
রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক সরকারের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনের ভূমিকাও অপরিসীম। একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, ক্ষমতার পালাবদল হতে পারে, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে যায়। সেই কারণে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত—পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। অথচ বাস্তবতার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই—সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে কি প্রশাসনিক সংস্কৃতিও বদলায়, নাকি শুধু বদলে যায় কিছু মুখ?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিবারই জনগণের সামনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। নতুন সরকার আসে নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে, রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলে, সুশাসনের অঙ্গীকার করে। কিন্তু কয়েক বছর পর একই প্রশ্ন আবার সামনে আসে—সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু প্রশাসনের সংস্কৃতি কতটা পরিবর্তিত হয়েছে? নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতা, বদলিতে নীতি, পদোন্নতিতে কর্মদক্ষতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ কতটা নিশ্চিত করা গেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সচিবালয়ের ফাইল কিংবা সরকারি প্রজ্ঞাপনে পাওয়া যাবে না। উত্তর খুঁজতে হবে মাঠে—জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে, উপজেলা প্রশাসনে, ভূমি অফিসে, থানায়, সরকারি হাসপাতাল, পাসপোর্ট অফিস, বিভিন্ন অধিদপ্তর ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে। কারণ একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের বাস্তব পরিচয় কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়; রাষ্ট্রের পরিচয় হলো তিনি সরকারি অফিসে গিয়ে কী ধরনের সেবা পেলেন, কত সময় লাগল, কতবার তাকে ঘুরতে হলো এবং তার ন্যায্য অধিকার পেতে কোনো পরিচিত ব্যক্তির সুপারিশ প্রয়োজন হলো কি না।
জনপ্রশাসন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও স্বীকৃত হয়েছে। ২০২৪ সালে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন এবং পরবর্তী সময়ে এর প্রতিবেদন প্রকাশ প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। কিন্তু সংস্কারের সুপারিশ তৈরি করা আর সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। আসল পরীক্ষা শুরু হয় বাস্তবায়নের জায়গায়।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দিয়ে শুরু করা যাক। একটি সরকারি চাকরি লাখো তরুণের কাছে শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগ নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক। একজন তরুণ বছরের পর বছর পড়াশোনা করে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেন, রাত জেগে প্রস্তুতি নেন। তার প্রত্যাশা থাকে—মেধা, যোগ্যতা ও নিয়মের ভিত্তিতে তিনি মূল্যায়িত হবেন। সেই জায়গায় যদি রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত তদবির কিংবা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ কোনোভাবে যোগ্যতার ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন চাকরিপ্রার্থী নন; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের মূল দর্শন হওয়া উচিত খুবই সরল—যোগ্য ব্যক্তি যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব পাবেন। কে কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করেন, কার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে কিংবা কে তাকে সুপারিশ করেছেন—এসব যেন নিয়োগের মানদণ্ড না হয়। কারণ প্রশাসনে প্রবেশের সময়ই যদি আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হয়, তাহলে পরবর্তী কর্মজীবনে নিরপেক্ষ প্রশাসনের প্রত্যাশা দুর্বল হয়ে পড়ে।
একইভাবে বদলি প্রশাসনের একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া। একজন কর্মকর্তাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বদলি করা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার অংশ। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে তখনই, যখন বদলি নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়—কোনো কর্মকর্তা নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করার কারণে কি তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো, নাকি প্রশাসনিক প্রয়োজনেই বদলি করা হলো? আবার কোনো কর্মকর্তা কি বিশেষ প্রভাবের কারণে দীর্ঘদিন সুবিধাজনক পদে বহাল থাকছেন?
এই প্রশ্নগুলোকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বদলি যদি কোনো কর্মকর্তার জন্য পুরস্কার বা শাস্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশাসনের অভ্যন্তরে একটি ভুল বার্তা যায়—আইন ও বিধি মেনে চলার চেয়ে ক্ষমতাবান মহলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর ফল দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করতে পারে।
পদোন্নতির ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি তার দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বাভাবিক অগ্রগতি। এখানে সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা ও দায়িত্ব পালনের রেকর্ড বিবেচিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু পদোন্নতি নিয়ে যদি রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা তদবিরের অভিযোগ সামনে আসে, তাহলে প্রশাসনের ভেতরেই আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। যোগ্য কর্মকর্তা যদি মনে করেন কর্মদক্ষতার চেয়ে পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে তার কর্মপ্রেরণা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—প্রশাসনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা মানে রাজনৈতিক সরকারের নীতি বাস্তবায়নে প্রশাসনের অনীহা নয়। নির্বাচিত সরকারের বৈধ নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নন। তারা রাষ্ট্রের কর্মচারী। তাদের দায়িত্ব আইন, সংবিধান, সরকারি বিধি এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষার কাঠামোর মধ্যে।
এই সীমারেখা যত স্পষ্ট হবে, প্রশাসন তত শক্তিশালী হবে।
আর প্রশাসনের প্রকৃত পরীক্ষা হয় মাঠপর্যায়ে। ঢাকায় বসে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা সহজ; কিন্তু সেই নীতিমালা একজন কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চাকরিপ্রার্থী কিংবা সাধারণ নাগরিকের জীবনে কতটা কার্যকর হলো—সেটিই বড় প্রশ্ন।
একজন কৃষক ভূমির কাগজ সংশোধনের জন্য অফিসে গিয়ে কতবার ঘুরলেন? একজন দরিদ্র মানুষ সরকারি ভাতা পেতে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় দিতে বাধ্য হলেন কি না? একজন ব্যবসায়ী বৈধ লাইসেন্স নিতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার হলেন কি না? একজন নাগরিক থানায় গিয়ে তার অভিযোগের যথাযথ প্রতিকার পেলেন কি না? একজন বিদেশগামী মানুষ পাসপোর্ট বা সংশ্লিষ্ট সেবা নিতে গিয়ে নিয়মের বাইরে কোনো সুবিধা নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলেন কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তরই প্রশাসনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।
সাংবাদিকতার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় আমরা প্রায়ই দেখি, সরকারি সেবার নিয়ম একদিকে আর মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্যদিকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আচরণ, দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি, তদবিরের প্রবণতা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ সাধারণ নাগরিকের সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে। তবে সাংবাদিকতার একটি মৌলিক নীতি হলো—অভিযোগকে কখনোই প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। অভিযোগের পাশাপাশি প্রয়োজন নথি, প্রত্যক্ষ তথ্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ।
এই জায়গাতেই একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।
কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার বক্তব্য নিতে হবে। কোনো নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থাকলে নিয়োগের বিধি, বিজ্ঞপ্তি, যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া দেখতে হবে। কোনো বদলি নিয়ে অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট আদেশ, সময়কাল এবং প্রশাসনিক ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে হবে। কোনো সম্পদ বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে নথি, সরকারি রেকর্ড ও নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করতে হবে। আর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বক্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও বক্তব্য না পাওয়া গেলে সেটিও প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত।
কারণ সাংবাদিকতার কাজ কাউকে আগে থেকেই দোষী সাব্যস্ত করা নয়। সাংবাদিকতার কাজ হলো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এবং জনগণের সামনে যাচাই করা তথ্য তুলে ধরা।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার প্রশ্নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা। শুধু একজন কর্মকর্তাকে বদলি করে বা একজনকে সরিয়ে দিয়ে প্রশাসনিক সংস্কৃতি বদলানো সম্ভব নয়। ব্যক্তি পরিবর্তন সাময়িক ফল দিতে পারে; কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নিয়ম, কাঠামো ও জবাবদিহির ব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে একই ধরনের সমস্যা আবার ফিরে আসতে পারে।
তাই প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকতে হবে। বদলির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। পদোন্নতিতে নিরপেক্ষ ও যাচাইযোগ্য মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে যথাসম্ভব লিখিত কারণ ও নথিভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—একটি রাজনৈতিক সরকার চলে গেলে প্রশাসন যেন ভেঙে না পড়ে এবং নতুন সরকার এলেই প্রশাসনিক আনুগত্যের নতুন প্রতিযোগিতা শুরু না হয়।
কারণ রাষ্ট্র কোনো দলের নয়।
রাষ্ট্র জনগণের।
সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়। প্রশাসন সেই রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিক কাঠামো। এই দুইয়ের দায়িত্ব আলাদা হলেও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সরকার নীতি নির্ধারণ করবে, প্রশাসন আইন ও বিধির মধ্যে থেকে তা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু প্রশাসনিক কর্মকর্তা যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হন, তাহলে রাষ্ট্রের পেশাগত প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়বে।
একজন কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তিনি একজন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা। তিনি কোন সরকারের সময়ে নিয়োগ পেয়েছেন, কোন রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে কিংবা কোনো বিশেষ মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা আছে কি না—এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত তার কর্মদক্ষতা, সততা ও আইন মেনে দায়িত্ব পালনের রেকর্ড।
একইভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছেও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—প্রশাসনকে দলীয় কাজে ব্যবহার করার সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা দুর্বল করতে পারে। তাই ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে পেশাগত কাঠামোর মধ্যে রাখা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রশাসনের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরবে, অনিয়মের তথ্য অনুসন্ধান করবে, জনগণের ভোগান্তির কথা প্রকাশ করবে এবং একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যও প্রকাশ করবে। গণমাধ্যমের কাজ হবে ক্ষমতার কাছে প্রশ্ন করা—কিন্তু প্রশ্নের উত্তর তৈরির দায়িত্ব তার নয়।
সাংবাদিকতার শক্তি পক্ষ নেওয়ায় নয়; সাংবাদিকতার শক্তি তথ্য যাচাইয়ে।
একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কোনো কর্মকর্তাকে হেয় করার জন্য নয়; বরং একটি সমস্যাকে দৃশ্যমান করার জন্য। একটি দায়িত্বশীল কলাম কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়; বরং রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার বিভিন্ন দিক নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা তৈরির জন্য।
সুশাসনের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি ও দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে রাখা। কারণ ব্যক্তি বদলানো যায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে টেকসই না করলে পরিবর্তন স্থায়ী হয় না।
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশাসনিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে—আমরা কি এমন একটি প্রশাসন গড়ে তুলতে পারব, যেখানে একজন নাগরিক তার অধিকার পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজবেন না; একজন চাকরিপ্রার্থী বিশ্বাস করবেন যে তার মেধাই তার প্রধান শক্তি; একজন কর্মকর্তা জানবেন যে আইন মেনে দায়িত্ব পালন করাই তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব; আর একজন সাংবাদিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রশ্ন করলে তাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল সরকারের হাতে নেই। প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ জনগণ—সবার সম্মিলিত ভূমিকার ওপর এর বাস্তবায়ন নির্ভর করে।
প্রশাসনিক সংস্কারের অর্থ শুধু নতুন আইন, নতুন কমিটি বা নতুন প্রজ্ঞাপন নয়। সংস্কারের প্রকৃত অর্থ হলো কাজের সংস্কৃতি বদলানো। ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, নিয়মের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা। তদবিরের পরিবর্তে প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা। ব্যক্তির ওপর নির্ভরতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা।
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভবন নয়, তার কর্মকর্তার সংখ্যা নয়, তার প্রশাসনিক আদেশের সংখ্যা নয়; সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নাগরিকের আস্থা।
আর সেই আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন একজন সাধারণ মানুষ সরকারি অফিসে গিয়ে মনে করেন—**আমি এখানে কারও অনুগ্রহ চাইতে আসিনি; আমি আমার প্রাপ্য সেবা নিতে এসেছি।**
দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসনের লক্ষ্যও শেষ পর্যন্ত সেখানেই—রাষ্ট্র যেন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, আইনের শাসন ও নাগরিকের অধিকারকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।
ক্ষমতার পালাবদল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু প্রতিটি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে যদি প্রশাসনিক আনুগত্যেরও পালাবদল ঘটে, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে। আর যদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও প্রশাসনের পেশাগত নিরপেক্ষতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি অটুট থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় হতে পারে।
সুতরাং আজকের বাংলাদেশের সামনে প্রশাসন নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি শুধু—কে কোথায় বদলি হলেন, কে কোন পদ পেলেন, কে পদোন্নতি পেলেন—তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, **সিদ্ধান্তগুলো কোন নিয়মে হচ্ছে, কতটা স্বচ্ছভাবে হচ্ছে এবং জনগণের স্বার্থ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।**
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব, নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব এবং সর্বোপরি জনগণের অধিকার।
কারণ সরকার পরিবর্তন হতে পারে, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলাতে পারে—কিন্তু জনগণের রাষ্ট্র যেন জনগণেরই থাকে, সেটিই সুশাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন তাই কোনো স্লোগান নয়; এটি একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক শর্ত।
লেখক: মোঃ শাহজাহান বাশার,সাংবাদিক, দৈনিক জনতার মতামত ও দৈনিক মানবাধিকার প্রতিদিন,যুগ্ম আহ্বায়ক, বাংলাদেশ অনলাইন গণমাধ্যম সম্পাদক পরিষদ, ঢাকা
মন্তব্য করুন