শেখ মোহাম্মদ পারভেজ, পাবনা
বছর ঘুরে আবারও আসছে শারদীয় দুর্গাপূজা। উৎসবকে ঘিরে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় বইতে শুরু করেছে আনন্দের হাওয়া। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত সময় পার করছেন উপজেলার পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা। দিন-রাত পরিশ্রম করে মাটির খেলনা ও গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরি করছেন তাঁরা। তবে আধুনিকতার ছোঁয়া, প্লাস্টিকের দাপট ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে তাঁদের ঐতিহ্যবাহী এই পেশা।
শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীতে উপজেলার বড়াল ও গুমানী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে বসে ঐতিহ্যবাহী পূজার মেলা। এ সময় হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। মেলায় মাটির তৈরি আকর্ষণীয় খেলনা ও গৃহস্থালি সামগ্রীর চাহিদা থাকে তুলনামূলক বেশি। তাই বছরের অন্য সময়ে কাজের চাপ কম থাকলেও পূজার মেলা সামনে রেখে ব্যস্ততা বেড়ে যায় মৃৎশিল্পীদের।
সরেজমিনে শুক্রবার সকাল ১০ ঘটিকায়
(৯ অক্টোবর) ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ ভাঙ্গুড়া পৌর শহরের কালীবাড়ি পালপাড়া ঘুরে দেখা যায়, কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ ছাঁচে ফেলে তৈরি করছেন বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র। আবার কেউ তৈরি করা খেলনা শুকিয়ে তাতে রং-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন নান্দনিক সৌন্দর্য। মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে পুতুল, হাতি, ঘোড়া, পাখি, হাঁস-মুরগি, মাটির ব্যাংক, ফুলদানি, চায়ের কাপ, পিঠা তৈরির ছাঁচ, হাঁড়ি-পাতিল, প্রদীপ, কলসসহ নানা ধরনের সামগ্রী।
শিশুদের বিনোদনের জন্য খেলনা তৈরির পাশাপাশি নারীরাও তৈরি করছেন মসলা রাখার পাত্র, হাঁড়ি এবং দেয়ালে ঝোলানোর শোপিস। মাটির তৈরি এসব পণ্যের বৈচিত্র্যময় নকশা ও স্বতন্ত্র সৌন্দর্য মেলায় আসা দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।
স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা জানান, বছরের অধিকাংশ সময় তাঁদের তেমন কাজ থাকে না। তবে দুর্গাপূজার মেলা উপলক্ষে মাটির পণ্যের চাহিদা বাড়ে। এ সময় কিছুটা বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু প্লাস্টিক, স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ও সিরামিকের পণ্যের প্রসারে মাটির তৈরি খেলনা ও গৃহস্থালি সামগ্রীর বিক্রি আগের তুলনায় কমেছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
ভাঙ্গুড়া পৌর শহরের কালীবাড়ি পালপাড়ার মৃৎশিল্পী শ্রী সাধন চন্দ্র পাল বলেন, “একসময় মৃৎশিল্পীদের বেশ কদর ছিল। সময়ের পরিবর্তনে এখন সেই কদর অনেকটাই কমেছে। এখন আর এ পেশায় সমৃদ্ধির আশা নেই। তবুও পূর্বপুরুষের কাছ থেকে শেখা কাজের প্রতি ভালোবাসা ও শিকড়ের টানে এখনো এ পেশা আঁকড়ে ধরে আছি।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিবারের মতো এবারও পূজার মেলায় বিক্রির জন্য হরিণ, হাতি, গরু, ঘোড়া, খরগোশ, উটপাখি, হাঁস, বক ও টিয়াসহ নানা ধরনের খেলনা তৈরি করছি। প্লাস্টিক ও স্টিলের পণ্যের ভিড়েও মানুষের ভালোবাসায় আমাদের মাটির পণ্য এখনো টিকে আছে।”
কবি, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী শেখ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও আধুনিক পণ্যের প্রসারে মাটির তৈরি জিনিসের পরিবর্তে বাজার দখল করছে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও সিরামিকের সামগ্রী। আধুনিক তৈজসপত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মাটির তৈরি অনেক পণ্য হারিয়ে গেছে। ঐতিহ্য রক্ষায় মৃৎশিল্পের হারানো সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
মৃৎশিল্পীরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ এবং মাটির পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তাঁদের প্রত্যাশা, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে এবং নতুন প্রজন্মও মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে উৎসাহিত হবে।
মন্তব্য করুন