News Admin
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:১৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

স্মরণে মতিন খসরু ,আইন, রাজনীতি ও ন্যায়বোধে উজ্জ্বল এক মানুষের বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কেউ চলে যান, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কর্ম থেকে যায়। সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দেয়, কিন্তু কিছু মানুষের জীবন ও আদর্শ মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ছিলেন তেমনই একজন মানুষ—যাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধ, আইন পেশা, রাজনীতি, সংসদ ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা।

কুমিল্লার বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন পরিচিত এক রাজনৈতিক মুখ। আইনাঙ্গনে তিনি ছিলেন দীর্ঘ অভিজ্ঞতার একজন আইনজীবী। জাতীয় রাজনীতিতে তিনি সংসদ সদস্য ও আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষ পর্যায়েও দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

২০২১ সালের ১৪ এপ্রিল তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যেন কুমিল্লার রাজনীতি ও আইনাঙ্গনের একটি পরিচিত অধ্যায়ের পর্দা নামে। কিন্তু মানুষ হিসেবে তাঁর কর্ম, রাজনৈতিক পথচলা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ভূমিকা তাঁকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে।

মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু

১৯৫০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া আবদুল মতিন খসরুর রাজনৈতিক ও সামাজিক পথচলা শুরু হয় তরুণ বয়সেই। কৈশোরে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনের গতিপথ ধীরে ধীরে রাজনীতির দিকে এগিয়ে যায়।

১৯৭১ সালে দেশ যখন মুক্তিযুদ্ধের আগুনে জ্বলছে, তখন তিনি বসে থাকেননি। মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তৎকালীন অবিভক্ত বুড়িচং থানার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

স্বাধীনতার পর শুরু হয় তাঁর আরেক লড়াই—আইনের পথে মানুষের অধিকার ও ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করার লড়াই।

আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট

১৯৭৮ সালে কুমিল্লা জজ কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মতিন খসরু। চার বছর পর ১৯৮২ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইন পেশায় যুক্ত হন।

কুমিল্লার আদালত থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত—দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি অর্জন করেন পেশাগত অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি। আইনজীবীদের সংগঠনেও তাঁর নেতৃত্বের স্বীকৃতি আসে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি জীবনের শেষ প্রান্তে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও নেন।

মানুষের আস্থায় পাঁচবার সংসদ সদস্য

রাজনীতির মাঠেও তাঁর পথচলা ছিল দীর্ঘ। কুমিল্লা-৫ আসন থেকে তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন—১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে।

একজন রাজনীতিকের জন্য বারবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া শুধু নির্বাচনী সাফল্য নয়; এটি দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততারও একটি প্রতিফলন। বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ার মানুষের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক তাঁকে কুমিল্লার রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে দেয়।

আইনমন্ত্রী হিসেবে যে অধ্যায় ইতিহাসে

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান আবদুল মতিন খসরু।

আইনমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময়ের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ছিল ১৯৭৫ সালের ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের পর এ উদ্যোগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করে।

তাঁর কাছে আইন ছিল শুধু আদালতের বিষয় নয়; আইন ছিল মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার একটি প্রধান মাধ্যম। সাধারণ মানুষের জন্য দ্রুত, সহজ, কম ব্যয়বহুল ও সহজলভ্য বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিলেন।

রাজনীতির পাশাপাশি সংগঠক

জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভার দায়িত্বের বাইরে দলীয় রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। পরে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতন এসেছে। কিন্তু রাজনীতি ও আইন—দুই অঙ্গনেই নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি।

জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসেও থেমে যাননি মতিন খসরু। ২০২১ সালের মার্চে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের ১৪ এপ্রিল বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে থেমে যায় তাঁর জীবনের পথচলা।

৭১ বছরের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। একজন আইনজীবী হারালেন তাঁর পেশাজগতের সহযোদ্ধাকে, একজন রাজনীতিক হারালেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীকে, আর কুমিল্লা হারাল পরিচিত এক রাজনৈতিক মুখকে।

মানুষ চলে যায়, আদর্শ থেকে যায়

মতিন খসরুর জীবনকে শুধু একজন আইনজীবী কিংবা রাজনীতিকের জীবন হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। তাঁর জীবনে একসঙ্গে মিশে ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আইন পেশার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সংসদীয় রাজনীতি এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা।

তাঁর জীবনের সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও ছিল—যেমনটি বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সক্রিয় প্রায় সব মানুষের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। তবে ইতিহাসে একজন মানুষের মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত তাঁর কাজ, সিদ্ধান্ত ও জনজীবনে রেখে যাওয়া প্রভাবের মধ্য দিয়েই হয়।

মতিন খসরুর ক্ষেত্রে সেই মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো হলো—মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, আইন পেশায় দীর্ঘ পথচলা, পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া, আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং আইনজীবীদের সর্বোচ্চ সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়া।

কুমিল্লার স্মৃতিতে মতিন খসরু

একজন রাজনীতিকের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো তাঁর পদ নয়, মানুষের মনে তাঁর জায়গা। পদ চলে যায়, ক্ষমতা বদলে যায়, রাজনৈতিক সময় পাল্টে যায়—কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায় কিছু মুখ।

আবদুল মতিন খসরুও তেমন একটি নাম।

বুড়িচংয়ের পথঘাট, আদালতপাড়া, রাজনৈতিক সভা কিংবা জাতীয় সংসদ—বিভিন্ন পরিসরে তাঁর দীর্ঘ উপস্থিতি তাঁকে কুমিল্লার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অংশ করে তুলেছে।

আজ তিনি নেই। নেই তাঁর কণ্ঠ, নেই রাজনৈতিক কর্মব্যস্ততা, নেই আদালতের সেই পরিচিত উপস্থিতি। কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের নানা অধ্যায় এখনো আলোচনায় আসে।

শ্রদ্ধায় স্মরণ

সময় চলে যায়। প্রজন্ম বদলে যায়। কিন্তু কিছু মানুষের জীবন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হয়ে ওঠে ইতিহাসের পাঠ।

অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরুর জীবনও তেমন একটি পাঠ—যেখানে একজন মানুষ একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী, রাজনীতিক, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে নিজের দীর্ঘ কর্মজীবন রেখে গেছেন।

তাঁর জীবনের ভালো দিকগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, ন্যায়বিচারের গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।

স্মরণে মতিন খসরু—একজন মানুষ, একটি কর্মময় জীবন, আর ইতিহাসের পাতায় থেকে যাওয়া একটি নাম।

মরহুম অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।আল্লাহ তাঁকে মাফ করে দিন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।

মন্তব্য করুন

[wpdevart_facebook_comment curent_url="https://dhakarbarta24.com/2026/09/02/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a7%87-%e0%a6%ae%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%96%e0%a6%b8%e0%a6%b0%e0%a7%81-%e0%a6%86%e0%a6%87%e0%a6%a8-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%a8/" order_type="social" title_text="" title_text_color="#000000" title_text_font_size="22" title_text_font_famely="monospace" title_text_position="left" width="100%" bg_color="#d4d4d4" animation_effect="random" count_of_comments="3" ]
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাটমোহরে পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু

রাজাপুরে প্রথমবার মাদকবিরোধী মিনি ম্যারাথন অনুষ্ঠিত

কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড: আটক ৩ , তদন্তে নতুন মোড়

অ্যাডভোকেট হাবিবুল হক পেলেন ‘টপ পারফর্মার অ্যাওয়ার্ড

কুমি শিক্ষিকার সন্তান অপ্রতিম হ ত্যা জড়িত সন্দেহে আটক তুহিন

কোটবাড়ী থেকে নিখোঁজ কুবি শিক্ষকের ১৩ বছরের ছেলে

মহান শিক্ষা দিবসে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্র ইউনিয়নের পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

ঈশ্বরদীতে বজ্রপাতে কৃষক নিহত, আহত ১

বাংলাদেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, পোশাকশিল্পে বাড়ছে ক্ষতি

শিশু কলি হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধন, ধর্ষণের অভিযোগ

১০

স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে সারাদেশে ১১৪ ভেন্যুতে পুলিশের নির্বাচনী প্রশিক্ষণ শুরু

১১

কুমিল্লায় নকল সিগারেট তৈরির কারখান! মেশিনসহ গ্রেফতার ৯

১২

মতিঝিল বিভাগে ডিএমপির অভিযানে গ্রেপ্তার ৫১

১৩

টেকনাফে ১০ হাজার ইয়াবাসহ তিন মাদক কারবারি আটক

১৪

মুরাদনগরে চাঞ্চল্যকর জোড়া খুন ২০ ঘণ্টার মধ্যে মূলহোতাসহ ৩ আসামি গ্রেফতার

১৫

নিখোঁজের সাতদিন পর বস্তাবন্দি শিশুর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার

১৬

শিক্ষা দিবস উপলক্ষে চুনারুঘাটে ছাত্র ইউনিয়নের কুইজ প্রতিযোগিতা ও লিফলেট বিতরণ

১৭

চাঁদের পাশে ‘সন্ধ্যাতারা’, বিরল সৌন্দর্যে মুগ্ধ আকাশপ্রেমীরা

১৮

চান্দিনায় ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ৩০হাজার টাকা নিলেন বিএনপির ৩নেতা!

১৯

মেধাবীদের বাংলাদেশ: স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা মো. আবু ছালেক সেলিম রেজা সৌরভ

২০