নিজস্ব প্রতিবেদন
বাংলাদেশের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ আজ বিদেশমুখী। উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, গবেষণা, উন্নত জীবনমান কিংবা পেশাগত নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষায় প্রতিবছর অসংখ্য মেধাবী তরুণ দেশ ছাড়ছেন। এই প্রবণতা নতুন নয়; বরং বিশ্বায়নের যুগে এটি একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। মানুষ জ্ঞান, দক্ষতা ও সুযোগের সন্ধানে সীমান্ত অতিক্রম করবে—এটাই আধুনিক বিশ্বের স্বরূপ। কিন্তু যখন একটি জাতির সবচেয়ে মেধাবী, উদ্ভাবনী ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় অংশ নিজের দেশকে সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং ত্যাগ করার জায়গা হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় থাকে না; এটি রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় অতিক্রম করে দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন, রপ্তানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি, বেকারত্ব, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি, ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থার সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্য এবং প্রশাসনিক জটিলতার মতো চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। এই দুই বাস্তবতাকে একসঙ্গে স্বীকার করাই পরিণত নাগরিকতার পরিচয়। কেবল সাফল্যের গল্প বললে যেমন সত্য আড়াল হয়, তেমনি শুধু ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরলেও জাতির সম্ভাবনা অস্বীকার করা হয়।
বিশ্বের ইতিহাস বলছে, কোনো উন্নত রাষ্ট্র একদিনে গড়ে ওঠেনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপান, বিভক্ত দক্ষিণ কোরিয়া, সম্পদস্বল্প সিঙ্গাপুর কিংবা ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো ইউরোপের বহু দেশ দীর্ঘ পরিকল্পনা, সুশাসন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের ওপর ভিত্তি করেই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। তাদের সাফল্যের মূল শক্তি ছিল রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে সম্মিলিত অঙ্গীকার। বাংলাদেশের জন্যও এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
আজ আমরা প্রায়ই “ব্রেইন ড্রেইন” বা মেধাপাচারের কথা বলি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—মেধা কেন দেশ ছেড়ে যেতে চায়? এর উত্তর খুঁজতে হলে কেবল তরুণদের দায়ী করলে চলবে না। একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে যোগ্যতা মূল্যায়িত হবে, উদ্ভাবন উৎসাহ পাবে, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়বে, উদ্যোক্তারা নীতিগত সহায়তা পাবেন এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা দৃঢ় হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে সততা, দক্ষতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলার। রাষ্ট্র ও নাগরিক—দুই পক্ষের দায়বদ্ধতার সমন্বয়েই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।
বিদেশে যাওয়া কখনোই অপরাধ নয়। বরং বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করা কিংবা বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা অর্জন একটি দেশের জন্যও সম্পদ হতে পারে। প্রশ্ন হলো, সেই জ্ঞান, প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ক কতটা দেশের উন্নয়নে ফিরে আসে। চীন, ভারত, আয়ারল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়—প্রবাসী মেধা, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরকে জাতীয় উন্নয়নের অংশে পরিণত করা গেলে একটি দেশ দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশেরও প্রয়োজন এমন নীতি, যা বিদেশে থাকা নাগরিকদের সঙ্গে দেশের কার্যকর জ্ঞান ও বিনিয়োগের সেতুবন্ধ তৈরি করবে।
অন্যদিকে, যারা দেশে আছেন, তাঁদের দায়িত্বও কম নয়। একটি রাষ্ট্রকে কেবল সরকার গড়ে তোলে না; একজন সৎ শিক্ষক, দায়িত্বশীল চিকিৎসক, নীতিবান সাংবাদিক, দক্ষ প্রকৌশলী, পরিশ্রমী কৃষক, স্বচ্ছ ব্যবসায়ী, জবাবদিহিমূলক জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন নাগরিক—সবাই মিলে রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণ করেন। প্রতিদিনের ছোট ছোট নৈতিক সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত একটি জাতির বড় অর্জনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থার পুনর্গঠন। নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা যেমন জরুরি, তেমনি রাষ্ট্রেরও নাগরিকের মেধা ও সম্ভাবনার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। যে সমাজে যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে যায়, যেখানে দুর্নীতি পরিশ্রমকে নিরুৎসাহিত করে, যেখানে প্রতিভা যথাযথ মূল্যায়ন পায় না—সেখানে বিদেশমুখিতা বাড়বে, সেটিই স্বাভাবিক। তাই উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, সুশাসন এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।
তরুণদের প্রতিও একটি স্পষ্ট আহ্বান রয়েছে। পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা না করে পরিবর্তনের অংশ হোন। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, সাংবাদিকতা কিংবা সামাজিক উদ্যোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ রয়েছে। উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস, গবেষণার মনোভাব এবং সামাজিক দায়িত্ববোধই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশ গড়ার দায়িত্ব কেবল নীতিনির্ধারকদের নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের।
দেশপ্রেম কেবল জাতীয় পতাকা উত্তোলন বা আবেগঘন স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত দেশপ্রেম হলো আইন মেনে চলা, দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করা, কর পরিশোধ করা, জনসম্পদ রক্ষা করা, মতভেদকে গণতান্ত্রিকভাবে ধারণ করা এবং নিজের পেশাগত দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করা। যে জাতি এই মূল্যবোধকে ধারণ করে, তার অগ্রযাত্রা দীর্ঘমেয়াদে কেউ থামাতে পারে না।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আজকের তরুণ প্রজন্ম। কেউ বিদেশে গিয়ে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, কেউ দেশে থেকেই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন, কেউ গবেষণাগারে নতুন আবিষ্কার করবেন, আবার কেউ ন্যায়বিচার ও সুশাসনের পক্ষে কলম ধরবেন। সব পথই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি বিষয় কখনো ভুলে গেলে চলবে না—যে দেশের মাটিতে আমাদের শিকড়, সেই দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা কখনো সীমান্ত পেরিয়ে শেষ হয়ে যায় না।
আজ সময় এসেছে একটি নতুন জাতীয় দর্শন গড়ে তোলার—যেখানে বিদেশে যাওয়া হবে জ্ঞান অর্জনের জন্য, কিন্তু দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকবে অটুট; যেখানে ব্যক্তিগত সাফল্য জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হবে; যেখানে রাষ্ট্র নাগরিককে সুযোগ দেবে, আর নাগরিক রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশের সামনে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনাও কম নয়। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, নৈতিক নেতৃত্ব, সুশাসন এবং সর্বোপরি সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে জাতি নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করে, তাকে দীর্ঘদিন পিছিয়ে রাখা যায় না।
তাই আজকের অঙ্গীকার হোক—হতাশা নয়, দায়িত্ব; নিরাশা নয়, উদ্যোগ; পলায়ন নয়, অংশগ্রহণ। কারণ একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম অন্য কেউ এসে করবে না। সেই দায়িত্ব আমাদেরই।
দেশ ছেড়ে নয়—দেশ গড়েই বাঁচতে হবে।
মন্তব্য করুন