বুড়িচং প্রতিনিধি
বর্ষার জল নামতেই যেন নতুন রূপে জেগে ওঠে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার দক্ষিণগ্রাম। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকজুড়ে ফুটে থাকা লাল, সাদা, নীল ও হলুদ পদ্ম দূর থেকে তৈরি করে রঙিন এক প্রাকৃতিক ক্যানভাস। প্রায় ২৫ একর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই পদ্মবিল এখন শুধু স্থানীয় মানুষের বিনোদনের জায়গা নয়—প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় এক গন্তব্য।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের পূর্ব পাশে রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণগ্রাম এলাকায় অবস্থিত বিলটি বর্ষায় যেন বদলে যায় এক অন্য জগতে। পানির ওপর সারি সারি পদ্মফুল, মাঝেমধ্যে শাপলার উপস্থিতি আর চারপাশের সবুজ—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় নৈসর্গিক পরিবেশ। বিলের আশপাশে দেখা যায় ডাহুক, সারস, বালিহাঁসসহ নানা প্রজাতির জলচর পাখি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে বিলপাড়।
দক্ষিণগ্রাম পদ্মবিলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি হলো এর দুর্লভ হলুদ পদ্ম। স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই পদ্ম শুধু সৌন্দর্যের কারণে নয়, উদ্ভিদবৈচিত্র্যের দিক থেকেও বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে।
বিলের হলুদ পদ্মের মূল, কাণ্ড, শাখা ও ফুল গবেষণার উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের একটি জলাভূমি ধীরে ধীরে গবেষক ও প্রকৃতিবিদদের আগ্রহের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে।
প্রকৃতিবিদদের মতে, একটি নির্দিষ্ট জলাভূমিতে বিরল উদ্ভিদ প্রজাতির টিকে থাকা ওই এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তাই পদ্মবিলকে শুধু পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে না দেখে একটি প্রাকৃতিক ও গবেষণামূল্যসম্পন্ন জলাভূমি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দক্ষিণগ্রাম পদ্মবিলের গুরুত্ব সামনে আসার পর ২০২১ সালে এর সার্বিক সংরক্ষণে ইউনেসকোর সহযোগিতা নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানা যায়। সে সময় বিলের প্রবেশপথসহ বিভিন্ন স্থানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, হলুদ পদ্মের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় লাল পতাকা টানানো এবং পাহারাদারের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা অনেকটাই কমে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও একই সঙ্গে বাড়ছে বিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ।
পদ্মবিলের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন আশঙ্কা। দর্শনার্থীদের একটি অংশ ছবি তোলা কিংবা বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য পদ্মফুল ছিঁড়ে ফেলছেন। কেউ কেউ পদ্মগাছের ওপর হাঁটাচলা করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উদ্ভিদের স্বাভাবিক বিস্তার।
কুমিল্লা জজকোর্টের এপিপি অ্যাডভোকেট আরিফুর রহমান শ্রাবণ বলেন, প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে কেউ যেন সেটি ধ্বংস না করেন। দর্শনার্থীদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, দক্ষিণগ্রাম পদ্মবিলকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি কুমিল্লার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পর্যটনস্থানে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে পদ্ম, জলজ উদ্ভিদ ও পরিযায়ী-স্থানীয় পাখির নিরাপদ আবাস হিসেবেও এর গুরুত্ব বাড়ানো সম্ভব।
তবে এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনা—নির্দিষ্ট দর্শনার্থী এলাকা, ফুল ও উদ্ভিদ না ছেঁড়ার কঠোর নির্দেশনা, নিয়মিত পাহারা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ।
বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক তানভীর হোসেন বলেন, দক্ষিণগ্রাম পদ্মবিল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। ফুল ছেঁড়াসহ যেকোনো অনিয়ম ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত নজরদারি শুরু হয়েছে।
প্রকৃতির এই সম্পদ রক্ষায় এখন প্রশ্ন একটাই—দক্ষিণগ্রাম পদ্মবিল কি শুধু বর্ষার কয়েক মাসের দর্শনীয় স্থান হয়ে থাকবে, নাকি পরিকল্পিত সংরক্ষণের মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের একটি অনন্য জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে?
কারণ, পদ্মবিলের সৌন্দর্য দেখতে মানুষের ভিড় যত বাড়ছে, ততই জরুরি হয়ে উঠছে একটি বিষয়—প্রকৃতিকে দেখতে গিয়ে যেন মানুষ প্রকৃতিকেই ধ্বংস না করে।
মন্তব্য করুন