নিজস্ব প্রতিবেদক | কুমিল্লা
দীর্ঘ এক দশক ধরে দেশের অন্যতম আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। এরই মধ্যে মামলায় গ্রেফতার হওয়া একমাত্র আসামি, সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। ফলে মামলার তদন্তের অগ্রগতি, বিচারপ্রক্রিয়া এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টার দিকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান হাফিজুর রহমান। গ্রেফতারের প্রায় তিন মাস ১২ দিন পর তিনি কারাগার থেকে বের হন।
কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহ আলম খান বলেন, উচ্চ আদালতের জামিন আদেশের কপি পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
তনু হত্যা মামলায় দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর কোনো গ্রেফতার না হলেও চলতি বছরের ২২ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে কুমিল্লার আদালত তাকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠান। রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম বলেন, জামিন-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক নথি এখনও তার হাতে পৌঁছেনি। তবে মামলার ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
মামলার তদন্তে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান এবং সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলমের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শাহিন আলম বর্তমানে কুয়েতে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে জাহিদুজ্জামানের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ডিএনএ প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণের কাজ চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিচারপ্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকার একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসসংলগ্ন ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে সে সময় বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠন আন্দোলন গড়ে তোলে।
দীর্ঘ তদন্তের পরও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় তনু হত্যাকাণ্ড এখনও দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিচারাধীন মামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মামলার সংক্ষিপ্ত চিত্র,ঘটনার তারিখ: ২০ মার্চ ২০১৬,ভুক্তভোগী: সোহাগী জাহান তনু, শিক্ষার্থী, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ,মরদেহ উদ্ধার: কুমিল্লা সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসসংলগ্ন এলাকা,প্রথম গ্রেফতার: ২২ এপ্রিল ২০২৬,গ্রেফতারকৃত: সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান,কারামুক্তি: ৪ আগস্ট ২০২৬ (জামিনে) ,তদন্তকারী সংস্থা: পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ,বর্তমান অবস্থা: তদন্ত চলমান; ডিএনএ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল; দুই সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ রয়েছে।
জামিনে মুক্তি পাওয়া মানে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি নয়। মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করবে।
মন্তব্য করুন