মোঃ শাহজাহান বাশার

মানুষের জীবনে সব হারানোর পেছনে ভাগ্য দায়ী নয়; কখনো কখনো ভুল মানুষকে বিশ্বাস করা, অতিরিক্ত সরলতা এবং সম্পর্কের প্রতি অন্ধ নির্ভরতাও জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। জীবনের পথ যত দীর্ঘ হয়, অভিজ্ঞতার ঝুলি তত ভারী হয়। আর সেই অভিজ্ঞতার প্রতিটি পাতা মানুষকে নতুন করে শেখায়—কে আপন, কে পর, কে ভালোবাসার আড়ালে স্বার্থ লুকিয়ে রাখে, আর কে নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকার যোগ্যতা রাখে।

জীবনের এই পর্যায়ে এসে উপলব্ধি করেছি, মানুষের কাছে আমার চাওয়া কখনোই খুব বেশি ছিল না। যাদের আপন ভেবেছি, যাদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি, তাদের কাছ থেকেও প্রত্যাশা ছিল সামান্য—প্রয়োজনের সময়ে অন্তত একবার যেন তারা পাশে দাঁড়ায়। অর্থ-সম্পদ কিংবা প্রতিদানের হিসাব নয়, চেয়েছি আন্তরিকতা, বিশ্বস্ততা এবং বিপদের দিনে একজন মানুষের নির্ভরযোগ্য উপস্থিতি। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা বারবার বুঝিয়েছে, সবাই সম্পর্কের মূল্য বোঝে না, সবাই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করতে জানে না।

কখনো যাকে নিজের মানুষ ভেবে হৃদয়ে জায়গা দিয়েছি, সেই মানুষই আমার সরলতাকে দুর্বলতা হিসেবে ব্যবহার করেছে। যাকে নিঃস্বার্থভাবে সহযোগিতা করেছি, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সে-ই দূরত্ব তৈরি করেছে। যাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার করতে চেয়েছি, তাদের কারও কারও কাছ থেকেই পেয়েছি অবহেলা, হতাশা কিংবা বিশ্বাসভঙ্গের কষ্ট। তখন মনে হয়েছে, জীবন যেন এক অদ্ভুত হিসাবের খাতা খুলে বসেছে—যেখানে যোগের চেয়ে বিয়োগ বেশি, প্রাপ্তির চেয়ে হারানোর গল্প দীর্ঘ।

তবু আমি বিশ্বাস করা বন্ধ করিনি। কারণ, আমার বিশ্বাস ছিল—আমি যদি কারও সঙ্গে প্রতারণা না করি, তাহলে সেও আমার সঙ্গে প্রতারণা করবে না। আমি যদি কারও বিপদে পাশে দাঁড়াই, তাহলে আমার বিপদেও সে হাত বাড়াবে। কিন্তু সময় আমাকে শিখিয়েছে, মানুষের বিবেক, মূল্যবোধ ও স্বার্থবোধ এক নয়। কেউ সম্পর্ককে দায়িত্ব মনে করে, কেউ প্রয়োজন; কেউ ভালোবাসাকে সম্মান করে, কেউ সেই ভালোবাসাকেই নিজের স্বার্থ পূরণের মাধ্যম বানায়।

বিশ্বাস মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, কিন্তু সেই বিশ্বাস কাকে দেওয়া হচ্ছে, তা বুঝতে না পারলে একসময় সেই সম্পদই গভীর ক্ষতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

জীবনের পথে চলতে গিয়ে দেখেছি, একজন মানুষকে চেনার জন্য তার সুন্দর কথা কিংবা বড় বড় প্রতিশ্রুতিই যথেষ্ট নয়। তাকে চিনতে হয় সময়ের পরীক্ষায়, বিপদের মুহূর্তে এবং স্বার্থের সংঘাতে। সুসময়ে পাশে থাকা সহজ, কিন্তু দুঃসময়ে হাত ধরে রাখার মধ্যেই মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়। যে মানুষ প্রয়োজনের সময় পাশে থাকে না, তার অনুপস্থিতি হয়তো কষ্ট দেয়; কিন্তু সেই অনুপস্থিতিই অনেক সময় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে ওঠে।

পেশাগত জীবনে আইন, ন্যায়বিচার, অধিকার ও দায়িত্বের নানা দিক নিয়ে ভাবতে হয়। আইনজীবী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, ন্যায়বিচারের ভিত্তি যেমন সত্য ও প্রমাণ, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি বিবেচনাবোধ থাকা জরুরি। কাউকে বিশ্বাস করা অপরাধ নয়, কিন্তু যাচাই না করে নিজের সবটুকু নির্ভরতা অন্যের হাতে তুলে দেওয়া অনেক সময় নিজের প্রতি অবিচার হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের প্রতি সহানুভূতি থাকবে, সহযোগিতার মানসিকতা থাকবে, কিন্তু সেই সঙ্গে থাকতে হবে আত্মসম্মান ও বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা।

আমরা অনেক সময় অন্যকে ভালো রাখতে গিয়ে নিজের কষ্টগুলো আড়াল করি। অন্যের বিপদে ছুটে যাই, অথচ নিজের বিপদের দিনে কাকে ডাকব, সেই মানুষটিকেও খুঁজে পাই না। অন্যের চোখের জল মুছিয়ে দিতে গিয়ে নিজের অশ্রু লুকিয়ে রাখি। অথচ দিনশেষে আমাদেরও একজন মানুষের প্রয়োজন হয়, যে কোনো স্বার্থ ছাড়া বলবে—‘চিন্তা করবেন না, আমি আছি।’ এই সামান্য আশ্বাসটুকু অনেক সময় বড় কোনো সাহায্যের চেয়েও মূল্যবান হয়ে ওঠে।

জীবনের কঠিন সময়ে রাতের নীরবতায় নিজের কাছে প্রশ্ন জেগেছে—কতজনকে আপন করেছি, কতজনকে হারিয়েছি, কত মানুষের জন্য নিজের সময় ও সামর্থ্য ব্যয় করেছি, আর প্রয়োজনের সময়ে কতজনকে পাশে পেয়েছি? এসব প্রশ্নের উত্তর সব সময় আনন্দের হয়নি। কখনো মনে হয়েছে, জীবনের প্রাপ্তির খাতা বড় অসম্পূর্ণ। কিন্তু গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, হারানোর মধ্যেও শিক্ষা থাকে, ব্যর্থতার মধ্যেও উপলব্ধি থাকে, আর প্রতারণার অভিজ্ঞতার মধ্যেও নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ থাকে।

আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি আঘাত মানুষকে দুর্বল করে না; কিছু আঘাত মানুষকে পরিণত করে। প্রতিটি বিশ্বাসভঙ্গ মানুষকে নিষ্ঠুর করে তোলে না; কিছু অভিজ্ঞতা মানুষকে আরও সতর্ক, সংযত ও বিবেকবান করে। তাই যারা কষ্ট দিয়েছে, তাদের প্রতি ঘৃণা পুষে রেখে নিজের জীবনকে বিষাক্ত করতে চাই না। বরং তাদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই।

এর অর্থ এই নয় যে, বারবার প্রতারিত হয়েও একই ভুল করতে হবে। ক্ষমা করা মহৎ, কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া মহত্ত্ব নয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবিকতা, কিন্তু নিজের অস্তিত্বকে অবহেলা করা নয়। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব কখনোই একজনের একার হতে পারে না। যে সম্পর্কে সম্মান নেই, যে সম্পর্কে কেবল একজনই ত্যাগ স্বীকার করে, যে সম্পর্কে বিশ্বাসের মূল্য নেই—সেই সম্পর্কের বাস্তবতা মেনে নেওয়াও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

আজ বুঝতে শিখেছি, সবাইকে আপন ভাবা যায় না, সবাইকে নিজের মনের দরজা খুলে দেওয়া যায় না। মানুষকে ভালোবাসতে হবে, তবে বিবেক দিয়ে; বিশ্বাস করতে হবে, তবে সময় নিয়ে; সহযোগিতা করতে হবে, তবে নিজের সামর্থ্য ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে। কারণ, নিজের ভালোত্বকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও নিজেরই।

জীবনের অঙ্ক হয়তো আজও মেলেনি। অনেক প্রাপ্তি অপূর্ণ রয়ে গেছে, অনেক সম্পর্ক মাঝপথে থেমে গেছে, অনেক প্রত্যাশা বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়েছে। যাদের হারানোকে একসময় নিজের ব্যর্থতা মনে করেছি, সময়ের সঙ্গে বুঝেছি, তাদের সবাইকে ধরে রাখাই জীবনের সাফল্য ছিল না। কিছু মানুষ চলে যায় আমাদের শূন্য করে দিতে নয়, বরং জীবনের কোন জায়গায় সীমারেখা টানতে হবে, তা শিখিয়ে দিতে।

হয়তো একদিন জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারব, যে কান্নাকে অভিশাপ ভেবেছিলাম, সেই কান্নাই আমাকে অন্যের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছে। যে বিশ্বাসভঙ্গ আমাকে নীরব করেছিল, সেটিই আমাকে মানুষের আচরণ বুঝতে সাহায্য করেছে। আর যে হারানোর বেদনাকে একসময় জীবনের পরাজয় মনে হয়েছিল, সেটিই হয়তো আমাকে আরও শক্ত, ধৈর্যশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

দিনশেষে গভীর রাতে যখন পুরোনো স্মৃতি ও অপূর্ণ প্রত্যাশাগুলো বুকের ভেতর ভারী হয়ে ওঠে, তখন নিজেকেই বলি—জীবনের হিসাব এখনো মেলেনি, হিসাবের খাতাও এখনো বন্ধ হয়নি। যত দিন বেঁচে থাকব, তত দিন চেষ্টা করব নিজের বিশ্বাস, সততা ও মানবিকতা ধরে রাখতে। মানুষের প্রতারণার কারণে নিজের চরিত্র বদলে ফেলব না, অন্যের অবহেলার কারণে নিজের মূল্য ভুলে যাব না।

কারণ, জীবনের প্রকৃত জয় প্রতিশোধ নেওয়ার মধ্যে নয়; প্রকৃত জয় হলো প্রতারণার শিকার হয়েও প্রতারক না হওয়া, কষ্ট পেয়েও অন্যকে কষ্ট দেওয়ার পথ বেছে না নেওয়া এবং হতাশার মধ্যেও নিজের বিবেককে অটুট রাখা।

জীবনের হিসাব হয়তো এখনো মেলেনি, কিন্তু বিশ্বাসের মৃত্যু ঘটতে দিইনি। মানুষের আচরণ আমাকে সতর্ক করেছে, অভিজ্ঞতা আমাকে পরিণত করেছে, আর কষ্ট আমাকে শিখিয়েছে—নিজেকে হারিয়ে কাউকে পাওয়া যায় না। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমার লড়াই চলবে; তবে সেই লড়াই কারও বিরুদ্ধে নয়, নিজের সততা, আত্মমর্যাদা ও মানবিকতাকে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য।

লেখক: আইনজীবী হাবিবুল হক