শেখ মোহাম্মদ পারভেজ, পাবনা
পাবনার সাঁথিয়ায় অসুস্থ বৃদ্ধা মায়ের ভরণপোষণ ও আশ্রয়ের দাবিতে ইউএনওর দ্বারস্থ হয়েছেন মুন্নি খাতুন। তবে মাকে সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ছেলে সাগর হোসেন বলেছেন, মাকে সঙ্গে দিলে তিনি আত্মহত্যা করবেন।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা মুন্নি খাতুনকে নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ছেলে সাগর হোসেন। মায়ের আশ্রয় ও ভরণপোষণের দাবিতে করা লিখিত অভিযোগের শুনানিতে এমন ঘটনা ঘটে। এ সময় ছেলের কাছে শেষ বয়সে একটু আশ্রয় চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মুন্নি খাতুন।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে এ অভিযোগের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদ মা-ছেলের বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেন। তবে মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি হননি সাগর। তিনি মাকে মাসিক কত টাকা দিতে হবে, তা নির্ধারণ করে দেওয়ার অনুরোধ জানান।

সাগর হোসেন সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ হিসেবে কর্মরত। তিনি উপজেলার সোনাতলা গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলাম ও মুন্নি খাতুন দম্পতির ছেলে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুন্নি খাতুনের স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন। তাঁদের দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত বৃদ্ধা মুন্নি খাতুনের একমাত্র অবলম্বন এখন ছেলে সাগর। তবে ছেলের বিয়ের পর থেকে পারিবারিক বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে সাগর মায়ের ভরণপোষণ বন্ধ করে দেন এবং তাঁকে নিজের সঙ্গে রাখতেও অনীহা প্রকাশ করেন।

মুন্নি খাতুন জানান, ছেলের কাছে আশ্রয় ও দেখভালের প্রত্যাশায় তিনি একাধিকবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে গেছেন। স্থানীয়ভাবে সালিস-বৈঠকের মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করা হলেও ছেলের অনাগ্রহে তা সফল হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগের শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদ সাগরকে তাঁর বৃদ্ধ ও অসুস্থ মাকে সঙ্গে রেখে দেখাশোনার অনুরোধ জানান। মায়ের শেষ বয়সের নিরাপত্তা ও মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দেন তিনি। কিন্তু সাগর নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন।

এ সময় সাগর বলেন, ‘মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব। আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব।’

উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ইউএনও সাগরকে চিন্তা-ভাবনার জন্য কয়েক দিন সময় দেন। এ সময়ের মধ্যে মায়ের ভরণপোষণ ও আশ্রয়ের বিষয়ে সম্মানজনক সমাধানে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মুন্নি খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন, মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। আমি একজন হার্টের রোগী। এই অবস্থায় ছেলেকে ছাড়া আমার আর কে আছে? আমি তো টাকা-পয়সা চাই না; নুন-পান্তা খেয়ে হলেও ছেলের সঙ্গে বাকি জীবনটা পার করে দিতে চাই। আমি মায়ের অধিকার নিয়ে ছেলের ঘরে একটু আশ্রয় চেয়েছি, এর বেশি তো কিছু চাইনি।’

নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান বলেন, মা-ছেলের বিরোধ মেটাতে তিনি শুরু থেকেই চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ছেলে কোনোভাবেই রাজি হননি। স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মুন্নি খাতুন ইউএনওর কাছে যান।

সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে ডেকে শুনানি করা হয়েছে। একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা তাঁর ছেলের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ প্রত্যাশা করছেন। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে ছেলেকে বোঝানো হয়েছে এবং তাঁকে কয়েক দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কীভাবে বিষয়টির সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পারিবারিক বিরোধ যেন আরও জটিল না হয় এবং বৃদ্ধা মাকে যেন কষ্ট পেতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখেই সমাধানের চেষ্টা চলছে।