শেখ মোহাম্মদ পারভেজ,পাবনা
পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলুনিয়া গ্রামের ১০ বছরের শিশু শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলি ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার মোস্তফা কামাল রিমান্ডে পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে মোস্তফা ধর্ষণ ও হত্যার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন এবং ঘটনায় আরও একজন জড়িত থাকার কথা বলেছেন। তবে অপর আসামি ইয়াসিন আলী এ ঘটনায় ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই বেনু রায় পিপিএম জানান, পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, মাগরিবের নামাজের পর কলিকে মোস্তফার মুদি দোকানের পেছনের একটি কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে ধর্ষণ করা হয় এবং এর প্রায় ১৫ মিনিট পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কলিকে খোঁজার কাজেও মোস্তফা অংশ নেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার পর মোস্তফা গোসল করে রাত ১০টার দিকে আবার তাঁর মুদি দোকান খোলেন। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মোস্তফার দেওয়া তথ্য ও অন্যান্য আলামত যাচাই করা হচ্ছে।
অপর আসামি ইয়াসিন আলীর দাবি, তিনি ধর্ষণ ও হত্যার কোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যার পর মোস্তফা তাঁর কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন এবং তিনি শুধু মরদেহ গোপনের কাজে সহযোগিতা করেন।
নিখোঁজের সাত দিন পর মরদেহ উদ্ধার
গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর আল ফালাহ একাডেমির চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলি নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মোস্তফা কামাল ও তাঁর ভাড়াটিয়া ইয়াসিন আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তা বেনু রায় বলেন, মরদেহ উদ্ধারের দিনই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত শুরু করা হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে সন্দেহভাজন হিসেবে দুজনের নাম সামনে আসে। পরে তাঁদের আটকের সময় মোস্তফার আচরণ পুলিশের সন্দেহ আরও বাড়ায়।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পরও মোস্তফা নিহত শিশুর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। এমনকি কলির নিখোঁজের বিষয়ে গভীর রাতে পরিবারের সদস্যদের মোবাইল ফোনে খোঁজখবর নেন। কলির সন্ধান ও বিচারের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ ও মানববন্ধনেও তিনি অংশ নেন বলে তদন্তে জানা গেছে। মরদেহ উদ্ধারের সময়ও তিনি ঘটনাস্থলের আশপাশে ছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মোবাইল ফোনে ছবি পাওয়ার দাবি
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ঘটনার দিন সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে কলি তার ভাইকে নিয়ে মোস্তফার দোকানে চিপস কিনতে যায়। ওই সময় মোস্তফার মোবাইল ফোনে শিশুটির কয়েকটি ছবি তোলা হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি। পরে মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে এসব ছবি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ওই দিন সন্ধ্যায় কলি মোস্তফার দোকানের সামনে বসে ছিল। মাগরিবের নামাজ শেষে মোস্তফা তাকে দোকানের পেছনের একটি কক্ষে নিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে। সেখানে ধর্ষণের পর তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, মোস্তফার মোবাইল ফোনে আরও কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের আপত্তিকর ছবি পাওয়া গেছে বলে পুলিশ দাবি করছে। এসব ছবির বিষয়ে পৃথকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষা
মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা বেনু রায়। তিনি বলেন, ডিজিটাল ফরেনসিকসহ কয়েকটি পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া বাকি রয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর নিহত শিশুর বিভিন্ন আলামত রাজশাহী সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর ধর্ষণের ঘটনায় একজন নাকি দুজন জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে। এরপর দুই আসামিরও ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মোস্তফা দাবি করেছেন, দুজন মিলে কলিকে ধর্ষণ করেছেন। অন্যদিকে ইয়াসিন আলী বলেছেন, তিনি ধর্ষণ বা হত্যার কোনোটির সঙ্গেই জড়িত নন। হত্যার পর মোস্তফার অনুরোধে তিনি সহযোগিতা করেছেন। ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলে এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা হবে।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, প্রয়োজনীয় ফরেনসিক ও ডিজিটাল পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর দ্রুত আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হবে।
বাড়িতে ভাঙচুর, দ্রুত প্রতিবেদন দাবিতে বিক্ষোভ
এদিকে ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতা মোস্তফার বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এতে বাড়িটির বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মামলার দ্রুত তদন্ত ও সাত দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের দাবিতে ২০ সেপ্টেম্বর নিহত শিশুর স্বজন ও স্থানীয় লোকজন পাবনা আদালত ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করেন। এ সময় আন্দোলনকারীরা মামলার তদন্তে বিলম্ব হলে বৃহত্তর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।