মোঃ শাহজাহান বাশার
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০২ রাত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। দেশে গ্যাসের চাপ কমে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বিদ্যুৎ সরবরাহে দেখা দিচ্ছে ঘন ঘন বিঘ্ন। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় কমছে রপ্তানি আদেশ। সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প। কারখানা সচল রাখতে কোথাও অতিরিক্ত ডিজেল কিনতে হচ্ছে, আবার উৎপাদন বিলম্বের কারণে সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পেরে গুনতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে বিঘ্নের কারণে এশিয়ার স্পট এলএনজির দাম চলতি সপ্তাহে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছে। যুদ্ধের আগে যা ছিল প্রায় ১০ ডলার। জ্বালানি সংকটের কারণে চলতি বছর বিশ্ববাজারে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ কমেছে বলে জানিয়েছে শেল।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজিনির্ভর। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দেশের চাহিদা পূরণে এখন তুলনামূলক বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যবস্থায়। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতায় চলতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও আবার আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে কারখানা।
সংকটের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে পোশাকশিল্পের একটি কারখানায়। গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদনের মাঝপথে কারখানাটির একটি বয়লার নষ্ট হয়ে যায়। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মালিককে চীন থেকে কাপড় আনতে হয়। এতে নির্ধারিত সময়ে পণ্য প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। এর প্রভাব পড়ে বিদেশি ক্রয়াদেশেও। এক ক্রেতা ৫০ হাজার পিসের অর্ডার কমিয়ে ৪০ হাজার পিসে নামিয়ে আনেন। অর্থাৎ শুধু জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন বিলম্বের কারণে এক ধাক্কায় কমে যায় ১০ হাজার পিসের অর্ডার।
শুধু অর্ডার কমে যাওয়াই নয়, সময়মতো পণ্য পাঠাতে গিয়ে কারখানাগুলোকে বহন করতে হচ্ছে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা। জ্বালানি সংকটের কারণে একটি পোশাক কারখানাকে ফরাসি ক্রেতার কাছে হুডি জ্যাকেট নির্ধারিত সময়ে পাঠাতে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলার বিমানভাড়া দিতে হয়েছে। সাধারণ পরিবহন ব্যবস্থার তুলনায় এ ব্যয় বহুগুণ বেশি। একই সঙ্গে কারখানা চালু রাখতে অতিরিক্ত ডিজেলও কিনতে হচ্ছে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে—দুই দিক থেকেই চাপে পড়ছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর এক জরিপেও উঠে এসেছে সংকটের উদ্বেগজনক চিত্র। জরিপ অনুযায়ী, আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ কারখানার ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে অথবা কমেছে। একই সময়ে ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
গ্যাস-বিদ্যুতের এই সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পকারখানায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশের অন্যান্য খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। টাঙ্গাইলের এক পোলট্রি খামারি জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় শেডের বৈদ্যুতিক পাখা চালানো যাচ্ছে না। অতিরিক্ত গরমে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি মুরগি মারা যাচ্ছে। এতে খামারিদের উৎপাদন ব্যয় ও আর্থিক ক্ষতি দুটোই বাড়ছে।
হাসপাতালগুলোও রেহাই পাচ্ছে না। সিলেটের একটি হাসপাতালে প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জেনারেটরের সাহায্যে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র—আইসিইউ সচল রাখা গেলেও সাধারণ ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ বাড়ছে এবং হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় পরিস্থিতিতে সামান্য উন্নতি দেখা যাচ্ছে। তবে শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সংকট পুরোপুরি কেটেছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই।
এদিকে বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানেও গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখন শুধু জ্বালানি বাজারে সীমাবদ্ধ নেই; তা দক্ষিণ এশিয়ার শিল্প, ব্যবসা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞ ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশের শিল্পখাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গ্যাসের চাপ কমে একটি বয়লার নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে ১০ হাজার পিস রপ্তানি আদেশ হারানো, সময়মতো পণ্য পাঠাতে ৫০ হাজার ডলার বিমানভাড়া দেওয়া, অতিরিক্ত ডিজেল কেনা কিংবা বিদ্যুৎ না থাকায় পোলট্রি খামারে মুরগি মারা যাওয়ার মতো ঘটনাগুলোই দেখিয়ে দিচ্ছে—জ্বালানি সংকট এখন আর শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সমস্যা নয়; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের প্রায় প্রতিটি স্তরে।