মোঃ শাহজাহান বাশার

কাশ্মীর সমস্যা দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের অন্যতম জটিল ও স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিরোধ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ, সীমান্ত উত্তেজনা, সন্ত্রাসবাদ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা এই ইস্যুর স্থায়ী সমাধান আজও অধরা। তবে পরিবর্তিত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—কাশ্মীর সমস্যার সমাধান কি সামরিক বা কূটনৈতিক চাপের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব?

কাশ্মীরের ইতিহাস নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। ভারত ১৯৪৭ সালের ভারতভুক্তির দলিলের ভিত্তিতে জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে পাকিস্তান অঞ্চলটির বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে আসছে এবং কাশ্মীরের জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি করে। ফলে ইতিহাস, ভূখণ্ড, আত্মনিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীর ইস্যুতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের শ্রীনগর সফর। গত ১৯ আগস্ট জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর সঙ্গে বৈঠকের পর গোর জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং মার্কিন নাগরিকদের জন্য বিদ্যমান ভ্রমণ সতর্কতা পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনার কথাও জানান।

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ওই মন্তব্যের পর পাকিস্তান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। ইসলামাবাদে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায় এবং মন্তব্যটিকে কাশ্মীরের বিরোধপূর্ণ অবস্থান সম্পর্কে তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে অভিহিত করে।

অন্যদিকে ওমর আবদুল্লাহর অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে সতর্ক। তিনি বলেন, কাশ্মীরের সমস্যার সমাধান ওয়াশিংটনের মাধ্যমে নয়, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত।

এই পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করে, কাশ্মীর প্রশ্ন কেবল ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কাশ্মীরের মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তা, মানবিক অধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়।

কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও ধাপে ধাপে এগোনো একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি ও ধারাবাহিক সংলাপ পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা হলে পারস্পরিক অবিশ্বাস ধীরে ধীরে কমতে পারে।

দ্বিতীয়ত, কাশ্মীরের জনগণের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থবহ রাজনৈতিক সংলাপ জরুরি। স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক সুযোগ, মানবিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের উদ্বেগকে আলোচনার কাঠামোর বাইরে রেখে কোনো স্থায়ী সমাধান বাস্তবায়ন কঠিন।

তৃতীয়ত, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সীমান্তে উত্তেজনা কমানো, বাণিজ্য ও মানুষের যোগাযোগ বাড়ানো এবং পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্প্রসারণ আস্থার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

চতুর্থত, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সবচেয়ে বড় ক্ষত বহন করে সাধারণ মানুষই।

কাশ্মীর প্রশ্নে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থানও ভিন্ন। ভারত সাধারণত বিষয়টিকে দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যে সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেয়। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের মন্তব্যও এই সংবেদনশীলতার নতুন উদাহরণ তৈরি করেছে।

তবে বাস্তবতা হলো, বাইরের কোনো শক্তি এককভাবে কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাপিয়ে দিতে পারবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চাইলে ভারত ও পাকিস্তানকে সংলাপ, উত্তেজনা প্রশমন এবং মানবিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করতে পারে।

কাশ্মীর সমস্যার দীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘাটতি সম্ভবত পারস্পরিক আস্থার। ভারত পাকিস্তানকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে, পাকিস্তান ভারতের নীতিকে কাশ্মীরের জনগণের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করে; আর কাশ্মীরের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীরও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আকাঙ্ক্ষা।

তাই সমাধানের পথও একক কোনো সূত্রে আবদ্ধ হতে পারে না। প্রয়োজন বাস্তবতার স্বীকৃতি, রাজনৈতিক সাহস, ধারাবাহিক সংলাপ এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যদি যুদ্ধ, সন্ত্রাস বা সীমান্ত সংঘাতের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো দক্ষিণ এশিয়া। বিপরীতে ভারত, পাকিস্তান এবং কাশ্মীরের মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরির একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করা গেলে শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

অতএব, কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধানের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে—সংঘাত নয়, সংলাপ; অবিশ্বাস নয়, আস্থা; এবং সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে জনগণের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রক্রিয়া।